বাংলায় ছাপাখানার ইতিকথা



আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে তিনটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিষয় হল মুদ্রণ বিপ্লব, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও শিল্প বিপ্লব। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে মননশীলতার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল মুদ্রণ বিপ্লব। এই সময় কাঠ বা ধাতব টাইপের আবিস্কার হয়। এইভাবেই শুরু হয় ছাপাখানায় বইয়ের মুদ্রণ। এই মুদ্রণ শিল্পের আবিস্কার বিদ্যাচর্চাকে সাধারণ মানুষের কাছে সুলভে ও সহজে পৌঁছে দেয়।
ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম ইউরোপ থেকে ছাপাখানার মেশিন আমদানি করেন পর্তুগিজগণ। ১৫৫৬ সালে ভারতের গোয়ায় পর্তুগিজগণ দু’টি ছাপাখানা স্থাপন করেন।এই মুদ্রণ যন্ত্রে ১৫৬১ সালে মুদ্রিত হয়েছিল "Compendio Spiritual Da Vida Christa" নামে গ্রন্থটি, যেটি এখন সংরক্ষিত আছে নিউ ইয়র্ক এর পাবলিক লাইব্রেরিতে।  ১৮০৩ সালে ইংরেজরা যখন আগ্রা দুর্গ দখল করে তখন সেখানে একটি মুদ্রণযন্ত্র পাওয়া গেছে। আগ্রা দুর্গের ছাপাখানাই সম্ভবত উত্তর ভারতের সর্বপ্রথম ছাপাখানা।
১৬৮২ সালে প্যারিসে মুদ্রিত একটি গ্রন্থে বাংলা অক্ষরের নমুনা পাওয়া যায়। ১৭৭৬ সাল পর্যন্ত ইউরোপে বাংলা মুদ্রণের যে সকল প্রচেষ্টা হয়েছে তার কোনোটাতেই বাংলা টাইপ ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। চার্লস উইলকিন্সই প্রথম ব্যক্তি যিনি সম্পূর্ণ বাংলা অক্ষরের নকশা প্রস্তুত করেন। ১৭৭৮ সালে বাংলা মুদ্রণ জগতে স্মরণীয় বছর, কারণ এ বছর নাথানিয়েল ব্রাসি হলহেড রচিত A Grammer of the Bengal Language প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে সর্বপ্রথম বাংলা অক্ষর ব্যবহূত হয় যা উইলকিন্স খোদাই করেছিলেন। উইলকিন্স বাংলা মুদ্রণশিল্পের জন্মদাতা। তিনি এই কৌশলটি পঞ্চানন কর্মকার নামে একজন বাঙালিকে শিখিয়ে দিয়ে যান। পঞ্চানন কর্মকার উইলকিন্সের ছাপাখানায় সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করতেন। পঞ্চানন কর্মকারের মৃত্যুর পর তার পুত্র মনোহর অক্ষর খোদাই ও ঢালাইয়ের কাজ করেছেন। ১৮৪৬ সালে মনোহরের মৃত্যুর পর কৃষ্ণচন্দ্র কর্মকার তার স্থলাভিষিক্ত হন। ১৮৫০ সালে কৃষ্ণচন্দ্র কর্মকার মারা যান। এরপর কৃষ্ণচন্দ্র কর্মকারের দুই পুত্র রামচন্দ্র ও হরচন্দ্র এই অক্ষর নির্মাণের কাজে নিয়োজিত হন। পরবর্তী ৫০ বছরে বাংলা মুদ্রণ শিল্প ব্যাপক প্রসার লাভ করেছিল।
১৮৪৭-৪৮ সালে রংপুরে প্রথম ছাপাখানা ‘বার্তাবহ যন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৬০ সালে বাংলা প্রেস বা বাংলা যন্ত্র নামে ঢাকায় দ্বিতীয় ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ব্রজসুন্দর মিত্র। ১৮৬৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা মাত্র তিনটি ছাপাখানা ছিল। আর একটি প্রাচীন ছাপাখানা ছিল ফরিদপুরে। সেখান থেকে বাংলা ‘অমৃত বাজার’ পত্রিকা প্রকাশিত হতো।
বাংলা হরফের সংখ্যাধিক্য যান্ত্রিক বিন্যাসের জন্য বড় রকমের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনিতে মূল বাংলা বর্ণের সংখ্যা ৫০। কিন্তু যুক্তব্যঞ্জনের চেহারা বিভিন্ন হওয়ার কারণে এর সংখ্যা হয়েছিল প্রায় ৫০০। এই বিপুল সংখ্যক বর্ণের জন্য প্রয়োজন ছিল বিশাল কিবোর্ডের। সুরেশ চন্দ্র মজুমদার বাংলা বর্ণের ক্রম বজায় রেখে মূল চেহারা অপরিবর্তিত রেখে দুটি ছোট বর্ণকে পাশাপাশি বসিয়ে বর্ণের সংখ্যা কমিয়ে ফেললেন। ‘লাইনো টাইপে’ পরিবর্তন আনয়নের ফলে তার প্রভাব মনোটাইপ, ইন্টাটাইপ ও টাইপ রাইটারে এসে পড়ল। ফলে বাংলা কি-বোর্ডের আকার বিশাল করতে হলো না। প্রকৃতপক্ষে সুরেশ চন্দ্র লাইনোটাইপের প্রভাব আজও সর্বত্র বিদ্যমান। এ ছাড়া বাংলা মুদ্রণ শিল্পের উন্নয়নের স্মরণীয় নাম উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী।১৮৮৫ সালে বিদেশ থেকে আধুনিক উন্নত মুদ্রণ যন্ত্র এনে কলকাতার শিবনারায়ন দাস লেনে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৫ সালে এর নাম হয় ইউ রায় এন্ড সন্স। উপেন্দ্র কিশোর লেখার সাথে ছবির মুদ্রণ উন্নত করার জন্য ব্যবহার করেন ষাট ডিগ্রি স্ক্রিন, ডায়াফ্রাম পদ্ধতি, স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার যন্ত্র, ডায়ওটাইপ, রিপ্রিন্ট প্রভৃতি পদ্ধতি ব্যবহার করেন। ফটোগ্রাফি ও মুদ্রনশিল্প সম্পর্কে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য তাঁর পুত্র সুকুমার রায়কে ১৯১১ সালে ইংল্যান্ডে পাঠিয়েছিলেন।  বাংলায় মুদ্রণ শিল্পের প্রসারে আর এক জনের নাম না করলেই নয়, তিনি আর কেউ নন, আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর। ১৮৪৭ সালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে দেবার পর বিকল্প জীবিকা হিসেবে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তিনি ১৮৪৭ সালে ৬০০ টাকা ঋণ নিয়ে বন্ধু মদন মোহন তর্কালঙ্কারকে অংশীদার হিসেবে নিয়ে কলকাতায় সংস্কৃত যন্ত্র নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ অন্নদামঙ্গল। শুধু ছাপাখানা প্রতিষ্ঠাই নয়, ছাপা বই বিক্রির জন্য প্রতিষ্ঠা করেন সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি এবং কলকাতা পুস্তকালয় নামে দুটি দোকান।  

বাংলার বিভিন্ন ছাপাখানার নাম ও তার প্রতিষ্ঠাতার নাম


  1. শ্রীরামপুর মিশন প্রেস- উইলিয়াম কেরি
  2. ইউনিটেরিয়ান প্রেস- রামমোহন রায়
  3. শব্দ কল্পদ্রুম প্রেস- রাধাকান্ত দেব
  4. মথুরানাথ যন্ত্র- হরিনাথ মজুমদার (কাঙাল হরিনাথ)
  5. বঙ্গ দর্শন প্রেস- সঞ্জীব চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
  6. ন্যাশনাল মেশিন প্রেস- অশ্বিনী কুমার দত্ত
  7. সংস্কৃত যন্ত্র- ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর
  8. বীণা যন্ত্র- রাজকৃষ্ণ রায়
  9. সংবাদ প্রভাকর যন্ত্র- ঈশ্বর গুপ্ত
  10. শোভাবাজার প্রেস- কালীপ্রসন্ন দেব
  11. বাঙ্গালা যন্ত্র- দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ
  12. স্কুল বুক প্রেস- প্যারিচরন সরকার
  13. ন্যাশনাল প্রেস- নবগোপাল মিত্র
  14. অমৃত প্রবাহিণী যন্ত্র- শিশির কুমার ঘোষ
  15. গুপ্ত প্রেস- জগজ্জ্যতি গুপ্ত
  16. বেঙ্গলি প্রেস- গিরিশ চন্দ্র ঘোষ
  17. ইন্ডিয়ান মিরর প্রেস- কেশব চন্দ্র সেন
  18. ব্রাহ্ম মিশন প্রেস- শিবনাথ শাস্ত্রী
  19. ইউ রায় এন্ড সন্স- উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী
  20. বঙ্গাল গেজেটি প্রেস- গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্য
 পঞ্জিকায় বাঙালির প্রথম পছন্দ বেনীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা। কে এই বেনীমাধব?  👈Click here

Post a Comment

0 Comments