ভারতের সংবিধানঃ গনতন্ত্রের কাঠামো ও জনগনের অধিকার

ভারতের সংবিধানঃ গনতন্ত্রের কাঠামো ও জনগনের অধিকার

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ অগস্ট। অনেক ক্ষয়ক্ষতি, দেশভাগ শেষে স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের জন্ম হল। পলাশির যুদ্ধ থেকে ধরলে ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হল ভারতবর্ষ। ফলে একদিকে ছিল মুক্তির আনন্দ। কিন্তু অন্যদিকে দেশভাগের যন্ত্রণা। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে তখন ভারতের সামনে অনেক সমস্যা।সেই সবের মধ্যেই কাজ করে চলেছিল সংবিধান সভা। বানানো হচ্ছিল স্বাধীন ভারতের জন্য সংবিধান। দীর্ঘ তর্ক বিতর্ক আলাপ-আলোচনার শেষে তৈরি হল ভারতের সংবিধান। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর। গণপরিষদে গ্রহণ করা হল সংবিধানটি পরের বছরে ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতে কার্যকর হল সংবিধান সংবিধান বলতে বোঝায় কতকগুলি আইনের সমষ্টি সেই আইন মোতাবেক কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। রাষ্ট্র যেহেতু একটি প্রতিষ্ঠান, তাই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি সংবিধানের প্রয়ােজন হয়। রাষ্ট্রের নিরিখে সংবিধান হল সেইসব আইনকানুন, যার দ্বারা সরকারের ক্ষমতা, নাগরিকদের অধিকার এবং সরকার-নাগরিকদের সম্পর্ক পরিচালিত হয়। সংবিধান একটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল তখন ব্রিটিশ সরকারের আইন মোতাবেক ভারত শাসন করা হত। সেখানে ভারতীয়দের চাওয়া-পাওয়ার কোন প্রতিফলন ঘটত না। তাই ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাতীয় নেতৃবৃন্দ ভারতীয়দের জন্য একটি সংবিধান রচনার দাবি তুলতে থাকেন। কিন্ত ব্রিটিশ সরকার বিভিন্ন সময়ে শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে ভারতবাসীর কিছু কিছু দাবি মেনে নিলেও প্রশাসনের মূল নিয়ন্ত্রণ তারা নিজেদের হাতেই রেখেছিল। তবে ক্রমাগত আন্দোলনের চাপে ভারতবাসীর স্বাধীনতা সংবিধানের দাবিকে দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে তাই ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার একটি সংবিধান সভা গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। সভার কাজ হবে ভারতের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা।

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে গণপরিষদ গঠিত হয় . রাজেন্দ গণপরিষদের স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত হন। স্বাধীন ভারতের সংবিধান জন্য একটি খসড়া কমিটি গঠিত হয়। বি. আর. আম্বেদকরের সভাপতিত্বে সাতজনের খসড়া কমিটি সংবিধান রচনার কাজটি করেছিল।

 ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনা

 ভারতীয় সংবিধানের একটি প্রস্তাবনা রয়েছে। সংবিধানের আদর্শ উদ্দেশ্য প্রস্তাবনায় ঘােষণা করা হয়েছে। প্রস্তাবনাকেসংবিধানের বিবেক’ বাসংবিধান আত্মাবলা হয় সংবিধানের মূল প্রস্তাবনায় ভারতকে একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, প্রজাতন্ত্র বলা হয়েছে। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে সংবিধানের ৪২তম সংশোধনীতেসমাজতান্ত্রিকধর্মনিরপেক্ষ এই আদর্শদুটি যুক্ত করে ভারতকে সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র’ বলা হয়েছে। এই শব্দগুলির প্রত্যেকটির গভীর তাৎপর্য রয়েছে।

সার্বভৌম বলতে বোঝায় ভারতরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে চরম বা চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। বিদেশি কোন রাষ্ট্র বা সংস্থার আদেশ, নির্দেশ বা অনুরোধ ভারত মানতে বাধ্য নয়।

সমাজতন্ত্র বলতে সাধারণত উৎপাদনের উপকরণগুলির ওপর রাষ্ট্র তথা সমাজের মালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদিত সম্পদের সমান ভাগকে বোঝায়। কিন্তু ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় সমাজতান্ত্রিক শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে অন্য অর্থে। সেখানে মিশ্র অর্থনীতি অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিমালিকানা-নির্ভর অর্থনীতির মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

ধর্মনিরপেক্ষ বলতে বোঝানো হয়েছে ভারত রাষ্ট্রের নিজস্ব কোন ধর্ম নেই। বিশেষ কোন ধর্মের হয়ে কথা বলা বা বিরোধিতা করা কোনটাই রাষ্ট্র করবে না। প্রত্যেক নাগারিক তার নিজের বিশ্বাসমতো ধর্মাচরণ করতে পারবেন।

ব্যাপক অর্থে গণতন্ত্র বলতে সামাজিক-অর্থনৈতিক রাজনৈতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠার কথা বোঝায়' কিন্তু ভারতীয় সংবিধানে গণতন্ত্র বলতে মূলত প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার বোঝান হয়েছে। সেক্ষেত্রে ভোট দিয়ে কেন্দ্র প্রদেশগুলির আইনসভায় এবং বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধি নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে।

সাধারণতন্ত্র বলতে বোঝায় ভারতের শাসনব্যবস্থায় বংশানুক্রমিক কোন রাজা। বা রানির স্থান নেই। ভারতীয় শাসনব্যবস্থার শীর্ষে রয়েছেন রাষ্ট্রপতি। তিনিও ভারতের জনগণের দ্বারা পরােক্ষভাবে নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুযায়ী ভারতীয় শাসনতন্ত্রের উৎস ও রক্ষক ভারতীয় জনগণ। সেজন্য ভারতীয় সংবিধানে সাধারণতন্ত্র শব্দটি ব্যবহার হয়েছে।

কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগ

ভারতের সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীপরিষদ নিয়ে কেন্দ্রের শাসনবিভাগ গঠিত হয়। আইন এবং তত্ত্বগত দিক থেকে বিচার করলে রাষ্ট্রপতি হলেন কেন্দ্রের শাসনবিভাগের প্রধান। যদিও বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীপরিষদই রাষ্ট্রপতির নামে শাসনকার্য পরিচালনা করেন।

রাষ্ট্র পতি ।

 ভারতের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান। রাষ্ট্রপতি জাতির প্রতিনিধিত্ব করেন। ভারতের । রাষ্ট্রপতি এক বিশেষ পদ্ধতিতে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। একই ব্যক্তি একাধিক বার রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে পারেন। রাষ্ট্রপতির পদপ্রার্থী হতে গেলে ঐ ব্যক্তিকে কমপক্ষে ৩৫বছর বয়স্ক ভারতীয় নাগরিক এবং লােকসভায় নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে। সরকারি কোন লাভজনক পদে তিনি নিযুক্ত থাকতে পারবেন না।

উপরাষ্ট্র পতি

পদমর্যাদার দিক থেকে রাষ্ট্রপতির পরেই উপরাষ্ট্রপতির স্থান। উপরাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে গেলে কমপক্ষে ৩৫বছর বয়স্ক ভারতীয় নাগরিক এবং রাজ্যসভায় সদস্য হওয়ার মতো যোগ্যতা থাকতে হবে। উপরাষ্ট্রপতিও রাষ্ট্রপতির মতোই এক বিশেষ পদ্ধতিতে নির্বাচিত হন। পদাধিকার বলে উপরাষ্ট্রপতি রাজ্যসভায় সভাপতিত্ব করেন। উপরাষ্ট্রপতির কার্যকাল সাধারণত পাঁচ বছর।

কেন্দ্রীয় আইনসভা

রাষ্ট্রপতি ও দুইকক্ষ বিশিষ্ট একটি আইনসভা নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভা বা সংসদ গঠিত। কেন্দ্রীয় আইনসভা আইন রচনা, সংবিধান সংশোধন, করের হার নির্দিষ্ট করাপ্রভৃতি নানা কাজ করে থাকে।

 কেন্দ্রীয় আইনসভার উচ্চকক্ষকে বলা হয় রাজ্যসভা। ভারতীয় সংবিধান অনুসারে অনধিক ২৫০জন সদস্য নিয়ে রাজ্যসভা গঠিত হয়। রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে বিজ্ঞান, চারুকলা, সমাজসেবা প্রভৃতি ক্ষেত্রে খ্যাতিমান ১২জন ভারতীয় নাগরিককে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন। রাজ্যসভার সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হতে হলে কোন ব্যক্তিকে অন্তত ৩০ বছর বয়স্ক ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। রাজ্যসভার সদস্যরা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন।

 

 ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের নাম লোকসভা সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ ভাবে জনগনের দ্বারা লোকসভার প্রায় সকল সদস্য  নির্বাচিত হন।কেবল রাষ্ট্রপতি দু জন সদস্যকে মনােনীত করতে পারেন। সংবিধানে বর্তমান লােকসভার সদস্যসংখ্যা ৫৫২ করা হয়েছে। লােকসভার সদস্যপদে প্রার্থী হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে কমপক্ষে ২৫ বছর ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। ঐ ব্যক্তি কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের অধীনে চাকরিরত থাকতে পারবেন না। লোকসভার সদস্যরা সাধারণত পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন।  লোকসভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যক্ষ বা স্পিকার। অধ্যক্ষের অবর্তমানে উপাধ্যক্ষ বা ডেপুটি স্পিকার সভার কাজ পরিচালনা করেন। অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ উভয়েই লােকসভার সদস্যদের মধ্য থেকে এবং সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন।

প্রধানমন্ত্রী

ভারতের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারী। তিনি হলেন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান। রাষ্ট্রপতি দেশের সাংবিধানিক প্রধান হলেও, প্রধানমন্ত্রীই রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচালক। লােকসভা নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের নেতা বা নেত্রীকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। কোন দল বা জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে, তখন রাষ্ট্রপতি বিবেচনা করে লােকসভার সদস্যদের মধ্যে কাউকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত ঐ ব্যক্তিকে কিছুদিনের মধ্যে লােকসভায় বেশিরভাগ সদস্যের সমর্থন অর্জন করতে হয়। প্রধানমন্ত্রী একাধিক দফতরের দায়িত্ব নিজের হাতে রাখতে পারেন। তার পরামর্শ মতো রাষ্ট্রপতি অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন। প্রধানমন্ত্রী হলেন রাষ্ট্রপতি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম।

রাজ্যের আইনসভা

ভারতের সংবিধান অনুযায়ী ভারতের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে একটি করে আইনসভা রয়েছে। কোন কোন রাজ্যের আইনসভা এককক্ষবিশিষ্ট। আবার কোন রাজ্যের আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। যে সমস্ত রাজ্যের আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট তার উচ্চকক্ষের নাম বিধানপরিষদ এবং নিম্নকক্ষেরনাম বিধানসভা। পশ্চিমবঙ্গের আইনসভা একশন বিশিষ্ট, শধু বিধানসভা নিয়ে গঠিত। রাজ্যপাল, বিধানসভা এবং বিধানপরিষদ অ' কেবল রাজ্যপাল ও বিধানসভা নিয়ে রাজ্য আইনসভা গঠিত হয়।

রাজ্যপাল

বাজ্যের শাসনব্যবস্থায় সবার উপরে রাজ্যপালের স্থান। যদিও তিনি নিয়মতান্ত্রিক বা নামমাত্র প্রধান। রাজ্যপাল কেন্দ্রীয় সরকারের সুপারিশে রাষ্ট্রপতি দ্বারা পাঁচ বছরের জন্য নিযুক্ত হন। তিনি রাজ্যের জনগণের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত হন না।

সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যপাল পদে নিযুক্ত হতে হলে ঐ ব্যক্তিকে অন্তত ৩৫ বছর ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। তিনি কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের অধীনে চাকরি বা কোন লাভজনক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না। রাজ্যের রাজ্যপাল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়োগ করেন। মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শে অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন। এছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ ও সম্মানিত পদে ব্যক্তিদের নিয়োগ করেন রাজ্যপাল। রাজ্যে বিধানপরিষদ থাকলে " বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে রাজ্যপাল সেখানে নিয়োগ করেন।

বিধানসভা

১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য আইনসভার ক্ষেত্রে বিধানপরিষদকে বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারপর থেকে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য আইনসভায় কেবল বিধানসভা রয়েছে। বিধানসভার প্রায় সব সদস্য বা বিধায়কগণ প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত হন। কেবল কোন কোন বিধানসভায় একজন ইঙ্গ-ভারতীয় সদস্য রাজ্যপালের ইচ্ছানুযায়ী মনােনীত হতে পারেন।বিধান সদস্যদের মেয়াদ সাধারণত পাঁচ বছর।

 

মুখ্যমন্ত্রী

কেন্দ্রের মতো ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলিতে সংসদীয় সরকার রয়েছে। সেই সরকারের প্রধান হলেন মুখ্যমন্ত্রী। ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যপালকে সাহায্য করার ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য রাজ্যে একটি মন্ত্রীসভা থাকবে। ঐ মন্ত্রীসভার প্রধান হবেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের নেতা বা নেত্রীকে রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেন। মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শমতো রাজ্যপাল অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন। মুখ্যমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীসভার্তাদের কার্যাবলির জন্য বিধানসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন শ্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ

স্থানীয় বা আঞ্চলিক স্তরে স্বায়ত্তশাসন

ভারতের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সাধারণ জনগণ তাদের স্থানীয় অঞ্চলের শাসনব্যবস্থায় সরাসরি অংশ নিতে পাবেন। তারা নিজেরাই গ্রাম ও শহরের শাসন-প্রতিষ্ঠানগুলােকে পরিচালনা করতে পারেন। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলিতে স্থানীয় মানুষজন প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করার ফলে তাদের মধ্যে নাগরিক চেতনা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। তার ফলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সফল হয়। পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা গ্রামীণ ও পৌর দুটি ভাগে বিভক্ত।গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা পঞ্চায়েত ব্যবস্থা নামে পরিচিত। পঞ্চায়েত ব্যবস্থায়

তিনটি স্তর রয়েছে। সবথেকে নীচের স্তরে রয়েছে গ্রাম পঞ্চায়েত। তার উপরে রয়েছে পঞ্চায়েত সমিতি। তারও উপরে রয়েছে জেলা পরিষদ।

গ্রামপঞ্চায়েত

পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সর্বনিম্ন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্তর হল গ্রাম পঞ্চায়েত। পঞ্চায়েত আইন অনুসারে কতকগুলি পরপর সংলগ্ন গ্রাম বা গ্রামের সমষ্টি নিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকা নির্ধারিত হয়। গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রার্থী হতে হলে একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই পঞ্চায়েত অধীনস্থ ভােটার হতে হবে। কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের চাকরিজীবী কোন ব্যক্তি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রার্থী হতে পারেন না। পঞ্চায়েতের সদস্যরা সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। গ্রাম পঞ্চায়েতের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে পঞ্চায়েত প্রধান ও আর একজনকে উপপ্রধান নির্বাচন করেন। বর্তমানে প্রধান এবং উপপ্রধান পদটি এক-তৃতীয়াংশ মহিলা সদস্য এবং জনসংখ্যার অনুপাতে তফশিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে। গ্রাম পঞ্চায়েতের কার্যকাল সাধারণত পাঁচ বছর, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার তার মেয়াদ ছয় মাস বাড়াতে পারে। পঞ্চায়েত আইন অনুসারে প্রতিমাসে অন্তত একবার পঞ্চায়েতের সভা ডাকা বাধ্যতামূলক। গ্রাম পঞ্চায়েতের সভায় সাধারণত সভাপতিত্ব করেন গ্রামপ্রধান।

পঞ্চায়েত সমিতি

পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থার দ্বিতীয় স্তর হল পঞ্চায়েত সমিতি। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি ব্লক তৈরি হয়। সেই ব্লকের নাম অনুসারে নির্দিষ্ট পঞ্চায়েত সমিতির নামকরণ করা হয়।ব্লক উন্নয়নের সার্বিক দায়িত্ব পঞ্চায়েত সমিতিকে দেওয়া হয়েছে। পঞ্চায়েত সমিতিতে তফশিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের এবং কোন মহিলা সদস্য না থাকলে, সেক্ষেত্রে সরকার তাদের মধ্য থেকে সর্বাধিক দু-জন সদস্য নিয়োগ। করতে পারেন।

পঞ্চায়েত সমিতির নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রার্থীর সমান। যোগ্যতা থাকা প্রয়ােজন। পঞ্চায়েত সমিতির কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার গ্রাম পঞ্চায়েতের মতো পঞ্চায়েত সমিতির মেয়াদও ছয় মাস বাড়াতে পারে। পঞ্চায়েত আইনে প্রতি তিনমাস অন্তর সমিিতর সভা ডাকার কথা বলা হয়েছে। পঞ্চায়েত সমিতির নির্বাচিত সদস্যগণ নিজেদের মধ্য থেকে একজন সভাপতি ও একজন সহসভাপতি নির্বাচন করেন। সমিতির সভায় সভাপতি এবং তার অনুপস্থিতিতে সহসভাপতি সভাপতিত্ব করেন। সভাপতি ও সহসভাপতির পদটি গ্রাম পঞ্চায়েতের মতোই এক-তৃতীয়াংশ মহিলা এবং জনসংখ্যার অনুপাতে তফশিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত।

জেলা পরিষদ

২০১৩ খ্রিস্টাব্দের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের ১৯টি জেলার মধ্যে কলকাতা ও দার্জিলিং বাদে প্রত্যেকটি জেলায় জেলা পরিষদ রয়েছে। জেলা পরিষদে প্রার্থী হওয়ার জন্য কোন ব্যক্তির গ্রাম পঞ্চায়েত বা পঞ্চায়েত সমিতির প্রার্থীর সমতুল্য যোগ্যতা থাকা দরকার। জেলা পরিষদের কার্যকাল পাঁচ বছর। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে এর কার্যকাল কিছুটা সময় বাড়ানাে যায়। পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন অনুযায়ী জেলা পরিষদের ক্ষেত্রে তিনমাসে অন্তত একবার অধিবেশন ডাকা বাধ্যতামূলক। জেলা পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করেন সভাধিপতি। সভাধিপতির অবর্তমানে সহসভাধিপতি সভার এবং অন্যান্য কাজ পরিচালনা করেন। জেলাপরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা তাদের মধ্য থেকে একজনকে সভাধিপতি ও আর একজনকে সহসভাধিপতি নির্বাচন করেন। সভাধিপতি ও সহসভাধিপতি পূর্ণ সময়ের জন্য নিযুক্ত। নিজপদে থাকাকালীন কোন লাভজনক সংস্থা, ব্যবসা ও পেশায় নিযুক্ত থাকতে পারেন না।

পৌরসভা

পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনব্যবস্থার অন্যতম অঙ্গ পৌরসভা। রাজ্য সরকার প্রতিটি পৌর অলকে কতগুলি ওয়ার্ড-এ ভাগ করতে পারেন। সেই প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। পৌরসভার সদস্যদের বলে কাউন্সিলর। কোন ব্যক্তি ঐ এলাকার ভোটদাতা হলেই এলাকার কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেন। কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার বাকি যোগ্যতা গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্যের যোগ্যতার মতোই। পৌর এলাকার নির্বাচিত কাউন্সিলরদের নিয়ে তৈরি কাউন্সিলর পরিষদকেই পৌরসভা বলা হয়। ঐ পরিষদের কাজের মেয়াদ হল পাঁচবছর। কাউন্সিলর পরিষদ নিজেদের মধ্যে থেকেই একজন চেয়ারম্যান ও একজন ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচন করেন।

সামাজিক উন্নয়নে সংবিধানের ভূমিকা

ভারতের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলা আছে। তবুও নারী পুরুষকে সমাজে সমান চোখে দেখা হয় না। দৈনন্দিন জীবনে মেয়েরা,পরিবারে ও সমাজে নানা অবহেলার শিকার হয়। জন্মানাের পর কন্যাসন্তানদের অবহেলা ও পীড়নের শিকার হতে হয়। বিয়ের সময় চলে পণ দেওয়া-নেওয়ার  প্রথা।তাছাড়া নারী পাচারের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটে চলে। নারীদের বিরদ্ধে ঘটে যাওয়া এইসব অমানবিক ঘটনা রুখতে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

 নারীদের অধিকারগলিকে সুরক্ষিত করার জন্য বেশ কিছু আইনও বলবৎ করা হয়েছে। সেই আইনগুলি ভারতের সংবিধানের অন্তর্গত। পাশাপাশি নারীদের শিক্ষার প্রসারের উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে  নারীদেরও পুরুষের সমান সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসবের মাধ্যমে নারীর সামাজিক ক্ষমতা বাড়ানাের উদ্যোগ তৈরি হয়েছে। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে সংবিধানগতভাবে বলা হয়েছে যে, জমি ও সম্পত্তির অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও নারীদের পুরুষের সমান অধিকার দিতে হবে।

অনগ্রসর নাগরিকদের অধিকার রক্ষা

ভারতের জনসমাজের একটা বড়ো অংশ ঔপনিবেশিক আমলে পশ্চাদপদ শ্রেণিবলে পরিচিত হতেন। মূলত সামাজিকভাবে  ‘অস্পৃশ্য মানুষেরাই এ পরিচয়ের মধ্যে পড়তেন। তাছাড়া তাদের ‘তফশিলি জাতি, ‘হরিজন    দলিত' প্রভৃতি বলেও উল্লেখ করা হত। বস্তুত এই সমস্ত শব্দগুলি দিয়ে ভারতীয় সমাজে ঐ সব মানুষের সামাজিক অবস্থান বোঝানো হত। ১৯৩০-এর দশক থেকে ভারতের দলিত-সমাজ নিজেদের অধিকারের প্রসঙ্গে সচেতন হতে থাকে।

 সামাজিক অস্পৃশ্যতার সমস্যাকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার উদ্যোগ  প্রথম নিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধি। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে অসহযোগ প্রস্তাবে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণকে স্বরাজ অর্জনের জরুরি জরুরি শর্ত বলে উল্লেখ করেন তিনি। যদিও অসহযোগ আন্দোলন মিটে যাওয়ার পরে গান্ধির অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ কর্মসুচিতে কারোরই বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়নি। গান্ধি মূলত হিন্দু মন্দিরে হরিজনদের ঢুকতে পারার অধিকার নিয়েই আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। ফলে ধর্মীয় অধিকার পেলেও, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে হরিজনরা বঞ্চিত রয়ে গিয়েছিলেন। তাই সামাজিকভাবেও হরিজনদের অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি। অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ নিয়ে গান্ধির কর্মসুচির সঙ্গে বি. আর. আম্বেদকরের মতামতের পার্থক্য হয়েছিল। আম্বেদকর চেয়েছিলেন শিক্ষা, চাকরি ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রেও দলিতদের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে। ক্রমেই দলিতদের আলাদা রাজনৈতিক গােষ্ঠী হিসেবে দেখার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। আইন অমান্য আন্দোলন চলাকালীন আম্বেদকর দাবি করেন দলিতগ্রসমাজের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য তাদের আলাদা নির্বাচনের অধিকার দিতে হবে। কিন্তু মহাত্মা গান্ধি আম্বেদকরের এই প্রস্তাবের বিরােধিতা করেন। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে দলিত মানুষদের তফশিলি জাতি হিসাবে আলাদা নির্বাচনের অধিকার দেওয়া হয়। তার প্রতিবাদে গান্ধি আমরণ অনশন শুরু করেন। ফলে বাধ্য হয়ে আম্বেদকর গান্ধিকে অনশন তুলে নিতে অনুরোধ করেন। গান্ধি ও আম্বেদকরের মধ্যে একটি চুক্তি (পুনা চুক্তি) হয়। সেই চুক্তি অনুসারে দলিতদের আলাদা নির্বাচনের বদলে যৌথ নির্বাচনেই তফশিলি জাতির জন্য ১৫১টি আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্ত দ্রুতই দেখা যায় হরিজন বিষয়ে গান্ধির কর্মসূচিতে কংগ্রেসি নেতৃত্বের বিশেষ উৎসাহ নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রেই জাতপাতের বিষয়টিকে আদৌ গুরুত্ব দিতে নারাজ ছিলেন কংগ্রেসের অনেক নেতা। ফলে নিজেদের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার। জন্য দলিত-সমাজের আন্দোলন চলতেই থাকে। কিন্তু, তফশিলি সম্প্রদায়গুলি নিজেদের শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তােলার ক্ষেত্রে বিশেষ সফল হতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতার হস্তান্তরের ফলে তফশিলি সম্প্রদায়ের আন্দোলন এগােতে পারেনি।

অন্যদিকে, কংগ্রেসও ক্রমে তফশিলি সম্প্রদায়ের দাবিগুলির প্রতি আপাতভাবে সহমর্মী অবস্থান নিয়েছিল। সংবিধানের খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে আম্বেদকরের । নির্বাচন তারই প্রমাণ। আম্বেদকরের উদ্যোগেই স্বাধীন ভারতের সংবিধানে অস্পৃশ্যতাকে বেআইনি বলে ঘােষণা করা হয়। পাশাপাশি তফশিলি জাতি, উপজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর নাগরিকদের উন্নয়নের জন্য নীতি তৈরি করা হয়।

ভারতের সংবিধানে অবশ্য তফশিলি জাতি ও উপজাতির কোন সংজ্ঞা দেওয়া নেই। কিন্তু রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করে তফশিলি জাতি ও উপজাতির একটি তালিকা তৈরি করতে পারেন। ঐ তালিকা কেন্দ্রীয় আইনসভাকে দিয়ে সংশোধন করিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এইভাবে রাষ্ট্রপতির তরফে বিভিন্ন রাজ্যের তফশিলি জাতি ও উপজাতির একটি তালিকা তৈরি করে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। সেই মর্মে একটি আইনও বলবৎ করা হয়েছে।সেই তালিকায়  অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিকেও রাখা হয়েছে। তাঁদের জন্য যথাযথ অধিকার ও সংরক্ষণ করাহয়েছে। ইঙ্গ-ভারতীয় শ্রেণিকেও এই  তালিকায় রাখা হয়েছে। কিন্তু অনগ্রসর জাতি ও উপজাতি বলতে ঠিক কাদের বােঝায় স. সংবিধানে নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া নেই। পরবর্তীকালে অনগ্রসরতার কয়েক সরকারের তরফে ঠিক করে দেওয়া হয়। যেমন-

০ হিন্দু সমাজের বিধান অনুযায়ী যাঁরা সমাজের নীচুস্তরে অবস্থান করেন

 ০ যাঁদের মধ্যে শিক্ষার প্রচলন কম;

 ০ যাঁদের মধ্যে অতি অল্পসংখ্যক ব্যক্তি সরকারি চাকরি পেয়েছেন এবং

০ যাঁদেরমধ্যে শিল্প-বাণিজ্যেরপ্রসারও কম, তাঁরাই হলেন অনগ্রসরজাতি ও উপজাতি।

 ভারতীয় সংবিধানে সংখ্যালঘু বলতে সমাজে সংখ্যার ভিত্তিতেই সংখ্যালঘু বােঝানাে হয়েছে। সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে সংখ্যালঘুর ধারণা ব্যবহার হয়নি। সংবিধানগতভাবে সরকার সংখ্যালঘু মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত অধিকার রক্ষা করতে দায়বদ্ধ। ভারতীয় সংবিধান দেশের সংখ্যালঘুনাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। ভারতের সমস্ত মানুষকে তার নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা ও সংস্কৃতি সুরক্ষিত করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র কিংবা সরকার কোনভাবেই কোন সংখ্যালঘু সংস্কৃতির উপর, সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতি বা আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দিতে পারে না। এ ব্যাপারে সরকার কোন আইনও বলবৎ করতে পারে না। পাশাপাশি ভারতীয় সংবিধান ভাষার দিক থেকে সংখ্যালঘু মানুষদের অধিকারও সুরক্ষিত করেছে। যেমন, সাঁওতাল জনগণের অলচিকি লিপিকে ভারতের সংবিধানে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ভাষাগতভাবে সংখ্যালঘু গােষ্ঠীর শিশুদের জন্য প্রাথমিক স্তরে তাদের মাতৃভাষায় লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেছে সংবিধান। সরকারি ও সরকারি-অনুদানপ্রাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়-নির্বিশেষে সমস্ত নাগরিক সুযোগ পাবে। সরকারি অনুদান ও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সমস্ত রকম বৈষম্য দূর করার বলা হয়েছে। তফশিলি জাতি, উপজাতি ও বিভিন্ন অনগ্রসর নাগরিকের উন্নতির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সমস্ত নাগরিককে সমান মর্যাদা দেওয়া ভারতের সংবিধানের উদ্দেশ্য। সমস্ত নাগরিকের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংবিধান বদ্ধপরিকর।" জীৱন-জীবিকা ও শিক্ষার অধিকার স্বীকার করে নিয়ে ভারতের সংবিধান মানবিক দায়বদ্ধতার নজির রেখেছে।

 

Post a Comment

0 Comments